top of page

শিকাগো: নামেই শিহরণ!




শিকাগো। শৈশবে পড়েছি পৃথিবীর বৃহৎ কসাইখানা। পরে জেনেছি এর করুণ ইতিহাস। স্কুলে আমরা বাংলাদেশের বিখ্যাত স্থপতি এফ আর খানের অনন্য কীর্তি শিকাগোর সীয়ার্স টাওয়ারের কথা পড়েছি। একই সময়ে স্বামি বিবেকান্দর কথাও শুনেছি তিনি শিকাগোর ধর্ম সভায় বক্তৃতা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সারা বিশ্বে পালিত মে দিবসের সাথে ওতোপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত শিকাগো। নানা ভাবে শিকাগোর নাম শুনে শুনে আমাদের বেড়ে ওঠা।

আমেরিকার তিনটি বড় শহরের কথা বললে চলে আসবে যার নাম। ট্যুরিস্টদের আকর্ষণের কেন্দ্রভূমি। আকাশছোঁয়া ভবনের শহর। নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের শহর। ওহাইওর মতো শিকাগো নামটিও আমেরিকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের দেওয়া।


মে দিবস

শিকাগো শুধু আমেরিকায় কেন, সারা পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষের তীর্থভূমি। কারণ ১৮৮৬ সালে এই শহর থেকে একদিন যাত্রা শুরু হয়েছিল ‘মে দিবস’-এর।


আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস (মে দিবস নামেও পরিচিত) মে মাসের প্রথম দিনটিকে পৃথিবীর অনেক দেশে পালিত হয়। ১৮৮৬ সালের ১লা মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা শ্রমদিনের দাবীতে আন্দোলন রত শ্রমিকের ওপর গুলি চালানো হলে ১১ জন শহীদ হয়। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। এই হল আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের সূচনা। ১৮৯১ সালে প্যারিসেই আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। স্বীকৃতি পায় মে দিবস। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় এইদিন পালিত হয় না।



পৃথিবীর কসাইখানা

প্রায় ১৪৮ বছর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ঘটেছিল এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। এই আগুনের সূত্রপাত ঘটে ১৮৭১ সালের ৮ অক্টোবর রাতে। ১০ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত সেই আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে ‘গ্রেট শিকাগো ফায়ার’ বলা হয়।


ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে ভেঙে পড়ে সব ধরনের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো শিকাগো শহর। শহরের প্রায় ৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকাপুড়ে ছাই হয়ে যায় এই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে। প্রায় ৩০০-এর বেশি মানুষ জীবন্ত পুড়ে মারা যায়। তবে, উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কেবল ১২০ জনের লাশ। ১ হাজারের বেশি বসতবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, হোটেল, সরকারি-বেসরকারি অফিস সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। সেইসঙ্গে পুড়ে ছাই হয়ে যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। সেসব গুরুত্বপূর্ণ নথির মধ্যে ছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিঠি এবং শিকাগোর জনপ্রিয় আলোকচিত্রী আলেকজান্ডার হেসলারের তোলা কিছু দুষ্প্রাপ্য ছবি। এই ঘটনায় গৃহহীন হয় শহরের প্রায় ১ লাখ মানুষ।


ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ড ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ২২২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (মুদ্রাস্ফীতি হিসেবে যা এখন ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি)!পরবর্তী সময়ে, ১৯১০ সালের ২২-২৩ ডিসেম্বরে এই শহরের ইউনিয়ন স্টকইয়ার্ডসে ঘটে যায় আরেকটি অগ্নিকাণ্ড। এ অগ্নিকাণ্ডে ২১ জন অগ্নি-নির্বাপককর্মী প্রাণ হারান।

১৯৩৪ সালে ১৯ মে শিকাগোর ইউনিয়ন স্টকইয়ার্ডসে আরও একটি অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১ জন অগ্নি-নির্বাপককর্মী। আহত হন ৫০ জন। ৪০০-১০০০ গবাদি পশুর মৃত্যুসহ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই ৩ টি অগ্নিকাণ্ড রীতিমত এই শহরকে ‘কসাইখানা’তে পরিণত করেছিল।

মূলত, এই শহরে এত মানুষ ও গবাদি পশুর প্রাণহানি ঘটে যাওয়ার কারণে শিকাগোকে ‘পৃথিবীর কসাইখানা’ বলা হয়।



City of Steel

রেলপথ ও স্টকায়র্ডসহ বেশির ভাগ আগুন থেকে বেঁচে গিয়েছিল। পূর্ববর্তী কাঠের কাঠামোর ধ্বংসাবশেষের ওপরে ইস্পাত ও পাথরের আরও আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয় পরবর্তী সময়ে। বিশ্বব্যাপী নির্মাণের ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ স্থাপন করবে এসব। ইস্পাতের কাঠামো ব্যবহার করে ১৮৮৫ সালে শিকাগো বিশ্বের প্রথম আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণ করে।

বিশ্বের কোনো শহরই শিকাগোর চেয়ে বেশি আধুনিক ভবনের নকশা ও নির্মাণকে প্রভাবিত করেনি এবং কোনো উপাদানই সেই ভবনগুলোর নকশা ও নির্মাণে স্ট্রাকচারাল স্টিলের চেয়ে বেশি অবদান রাখে নি। ১৮৭১ সালের গ্রেট শিকাগো ফায়ারের ছাই থেকে শিকাগো আকাশচুম্বী ভবনের জন্ম হয়েছিল। শিকাগো পুনঃনির্মিত হওয়ার সাথে সাথে মহান স্থপতি এবং প্রতিভাবান স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়াররা বিল্ডিং নির্মাণে একটি নতুন ধারণা বিকাশের জন্য একসাথে কাজ করেছিলেন।

ছোটবেলায় স্কুলের বইয়ে পড়েছিলাম, ‘শিকাগো কেন ওপরের দিকে বাড়ে?’ আরও পড়েছিলাম, একজন বিশ্বখ্যাত আর্কিটেক্ট স্যার ফজলুর রহমান খানের কথা। তাঁর নকশায় সৃষ্টি সিয়ার্স টাওয়ারের কথা, যে সিয়ার্স টাওয়ার বিশ্বের বুকে টানা ২৪ বছর সবচেয়ে উঁচু ভবন ছিল। শিকাগো শহরে গিয়ে দেখার সৌভাগ্য হলো সেই ঐতিহাসিক ভবনটির। ভাবতেই গর্ব হলো যে ভবনটি একজন বাঙালির নকশা দিয়ে সৃষ্টি। এই ভবনের সামনে স্যার এফ আর খানের নামে একটি রাস্তাও আছে।


Windy City / বাতাসের শহর


শিকাগোর এই বিখ্যাত ডাকনামটির উৎস পুরোপুরি পরিস্কার নয়। বোধ হয় মিশিগান হ্রদের দিক থেকে শিকাগো শহর ও তার অলিগলিতে বয়ে চলা হিমশীতল বাতাসের আধিক্যই এর সম্ভাব্য কারণ।

আবার কারো কারো মতে, ১৮৭৬ সালে শিকাগো শহরে একটি টর্নেডো ঝড়ের আবির্ভাব ঘটেছিল। সেই থেকে “Windy city” কথাটির প্রচলন ঘটেছে বলে মনে করা হয়।

আরও একটি প্রচলিত তথ্য মতে, শিকাগো শহরের বাসিন্দারা, বিশেষ করে সেখানকার পলিটিশিয়ানরা ছিলেন খুবই বাতুল, বকবক করাটা ছিল তাদের স্বভাব। তাই, এই শিকাগোবাসীদের স্বভাবকে বোঝাতে “Full of hot air”(অর্থ- বাজে বকা অথবা খুব বেশী কথা বলা, উদাহরণঃ- “Did the salesman tell you anything new, or was he just full of hot air?” ) প্রবাদটি ব্যবহার করা হত। সেই ‘Full of hot air’ থেকেই ক্রমে “Windy City” বা বাতাসের শহর কথাটির উৎপত্তি হয়েছে ধরা হয়।



বাস্তবে না দেখে থাকলেও যারা মুভি দেখতে পছন্দ করেন তারা already শিকাগো শহরটিকে দেখেছেন বহুবার। ৮০/৯০ এর দশকে filmmaker দের লোকেশন পছন্দের তালিকায় এই শহর ছিল ভীষণ প্রিয়। যারা original English movie lover তারা 80s/90s এর বিভিন্ন movie তে বহুবার দেখেছেন এই শহরের অলি গলি। এছাড়া আমাদের ভীষণ প্রিয় Baby’s Day Out বা Home Alone অথবা Dhoom3, Transformers 4, Superman: Man of Steel, Colombiana, Eagle Eye, The Dark Knight, Batman Begins, Spider-Man 2 এই সব মুভির মাধ্যমেও আমাদের দেখা হয়েছে শিকাগোকে। যারা আমেরিকা যান বা যাবেন বলে plan করছেন চাইলেই ২/৩ দিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন শিকাগো থেকে।


কানিজ ফাতেমা: উদ্যোক্তা, প্রতিষ্ঠাতা: ট্রিপজিপ, প্রবাসী

Comments


bottom of page